কোলেস্টেরল কমানোর উপায়

বিভিন্ন খাদ্য উপাদান বিভিন্ন উপায়ে আমাদের দেহে কোলেস্টেরল কমিয়ে থাকে। এ সব খাদ্য উপাদানের মাঝে কিছু কিছু খাবার আমাদের দেহে দ্রবণীয় আঁশ সরবরাহ করে। যা পরিপাকতন্ত্রের কোলেস্টেরল ও কোলেস্টেরল তৈরিতে সাহায্যকারী উপাদানের সাথে যুক্ত হয়ে দেহ থেকে অপসারন করে। কিছু খাদ্য উপাদান পলি অসম্পৃক্ত ফ্যাট সরবরাহ করে যা সরাসরি ক্ষতিকর কোলেস্টেরল এল.ডিএল এর মাত্রা কমায়। আবার কিছু খাদ্য উপাদানে ঊদ্ভিজ্জ স্টেরলস এবং স্টেনলস উপস্থিত থাকে যা দেহের খারাপ কোলেস্টেরলগুলোকে কমায়। যেমন-

  • ওটস- কোলেস্টেরল কমানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হল, সকালের নাস্তায় ওটস/ ওটস জাতীয় খাবার গ্রহণ যা সহজভাবে তৈরি করা যায়। ২-৩ গ্রাম দ্রবণীয় আঁশ ওটস থেকে পাওয়া যায়, এর সাথে ১টা কলা বা কিছু স্ট্রবেরী মিশালে আরও আধা গ্রাম দ্রবণীয় আঁশ পাওয়া যাবে। সম্প্রতি হার্ভার্ড মেডিকেল হতে প্রকাশিত পুষ্টিনীতিমালায়, “প্রতিদিন ২০-৩৫ গ্রাম খাদ্যআঁশ গ্রহণ করতে সুপারিশ করেছে; যার মধ্যে ৫-১০ গ্রাম হবে দ্রবণীয় আঁশ।”
  • বার্লি এবং শস্যদানা- দ্রবণীয় আঁশ সরবরাহের মাধ্যমে বার্লি এবং অন্যান্য শস্যদানা হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
  • বীচি জাতীয় শস্য- বীচি জাতীয় শস্যে উচ্চমানের দ্রবণীয় আঁশ থাকে, যা হজমশক্তিকে ধীরগতি করে এবং ক্ষুধা নিবারণ করে, তাছাড়া বিভিন্ন উপায়ে খাবার তৈরিতে বৈচিত্রতা আনায় কোলেস্টেরল কমানোর পাশাপাশি যারা ওজন কমাতে চান তাদের বীচি জাতীয় শস্য গ্রহণ বেশ কার্যকরী।
  • বেগুন এবং ঢেঁড়স- দ্রবণীয় আঁশের ভাল উৎস হল বেগুন ও ঢেঁড়স, যা লো- ক্যালোরিযুক্ত।
  • বিভিন্নজাতের বাদাম- শস্যদানা এবং শস্যের মাপ বিষয়ক গবেষণায় দেখা গেছে যে, “কাঠবাদাম, আখরোট, চীনাবাদাম এবং অন্যান্য বাদাম হার্টের জন্য ভাল।” প্রতিদিন ২ আউন্স করে বাদাম গ্রহণ করা হলে তা ধীরে ধীরে এল ডি এল কমায় (৫ % পরিমাণ)। তাছাড়া বাদামে অন্যান্য আরও পুষ্টিউপাদান রয়েছে যা আমাদের হার্টকে রক্ষা করে।
  • উদ্ভিজ্জ তেল- রান্না এবং অন্যান্য খাদ্য প্রস্তুতকরনের সময় বাটার, ঘি এবং প্রাণীজ চর্বির পরিবর্তে উদ্ভিজ্জ তেল, যেমন- ক্যানোলা, সূর্যমুখীর বিচির তেল ইত্যাদি এল ডি এল কমাতে সাহায্য করে।
  • আপেল, আক্সগুর, স্ট্রবেরী, টক জাতীয় ফল- এই ফলগুলো পেকটিন সমৃদ্ধ, যা এক ধরণের দ্রবণীয় আঁশ। এটি LDL কমাতে সাহায্য করে।
  • স্টেরল ও স্টেনল দ্বারা সমৃদ্ধকৃত খাদ্য- উদ্ভিজ্জ গাম হতে নির্যাসকৃত স্টেরল ও স্টেনল, খাবার হতে দেহে কোলেস্টেরল শোষণের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। সেজন্য বাণিজ্যিকভাবে তৈরীকৃত খাবারে এধরণের উপাদানগুলো যোগ করছে। যেমন- মার্জারিন, চকলেট, কমলার জুস ইত্যাদি। বর্তমানে এ উপাদানগুলো সাপ্লিমেন্ট হিসেবে বাজারেও পাওয়া যাচ্ছে। দৈনিক ২ গ্রাম উদ্ভিজ্জ স্টেরল এবং স্টেনল গ্রহণ ১০% পর্যন্ত এলডিএল মাত্রা কমিয়ে থাকে।
  • সয়া- পূর্বে বলা হতো, সয়াবিন এবং তা হতে উদ্ভুত নানা খাদ্য, যেমন- টফু, সয়াদুধ, ইত্যাদি কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে থাকে। বিভিন্ন গবেষণায় তা আজ প্রমাণিত। দৈনিক ২৫ গ্রাম সয়া প্রোটিন গ্রহণ ৫-৬% পর্যন্ত এলডিএল মাত্রা কমিয়ে থাকে।
  • সামুদ্রিক মাছ- সপ্তাহে ২-৩ বার সামুদ্রিক মাছ গ্রহণ এলডিএল মাত্রা ২% কমিয়ে থাকে; মাংসের পরিবর্তে মাছ গ্রহণ যা স¤পৃক্ত চর্বি সরবরাহের মাধ্যমে LDLমাত্রা কমিয়ে থাকে এবং ওমেগা- ৩ সরবরাহ করে। এটি রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমায় এবং অস্বাভাবিক হৃদ¯পন্দন প্রতিরোধ করে হার্ট ভাল রাখে।
  • খাদ্যআঁশ সাপ্লিমেন্ট- দ্রবণীয় খাদ্যআঁশ সাপ্লিমেন্ট হিসেবে বর্তমানে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিদিন ২ চা চা ইষবগুলের ভূষির গ্রহণে প্রায় ৪ গ্রাম দ্রবণীয় আঁশ সরবরাহ করে যা মেটামিউসিল এবং অন্যান্য ল্যাক্সেটিভ হতে পাওয়া যায়।

পথ্য এবং জীবনযাপনের ভিন্নতার কারণে ক্ষতিকর এল ডি এল এর মাত্রা বৃদ্ধি এবং প্রতিরক্ষাকারী এইচ ডি এল এর মাত্রা নি¤œমুখী করে দেয়। জিনের পরিবর্তনেরও এতে ভূমিকা রয়েছে। যেহেতু আমরা জিনগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করতে পারি না, তাই নি¤œক্তো কাজগুলো আমরা করতে পারি-
সক্ত চর্বি- প্রাণীজ ও উদ্ভিজ্জ খাবার হতে সম্পৃক্ত চর্বি পাওয়া যায়। যেমন- লাল মাংস, চর্বিযুক্ত দুধ, ডিম, পাম তেল, নারিকেলের দুধ, কোকো বাটার। সম্পৃক্ত চর্বি খারাপ কোলেস্টেরল এল ডি এল এর মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু এর কিছু উপকারিতাও রয়েছে- এটি ট্রাইগ্লিসারাইড কমায় এবং এইচ ডি এল এর মাত্রা কিছুটা বাড়ায়।

হৃদরোগে সম্পৃক্ত চর্বি ভূমিকা এখনও বিতর্কিত। সে কারণে, সীমিত পরিমাণে সম্পৃক্ত চর্বি সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করাই শ্রেয়।

ট্রান্স ফ্যাট অর্থাৎ পোড়া তেল- ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণ থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়। এই ধরনের চর্বির পুষ্টিমূল্য নেই এবং স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। সম্প্রতি ঋউঅ সংস্থা ট.ঝ.অ তে ট্রান্স ফ্যাট সমৃদ্ধ খাবার সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। এটি সম্পুর্ণ রূপে কার্যকর হতে আরও ৩ বছর সময় লাগবে। কিন্তু খুশির খবর এই যে, ইউ এস এ’তে বিভিন্ন প্রকারের খাবারের প্রতিষ্ঠান এবং রেস্টুরেন্ট ট্রান্স ফ্যাটের পরিবর্তে স্বাস্থ্যকর চর্বির ব্যবহার শুরু করেছে। দোকানের ভাজাপোড়া খাবার যতটুকু সম্ভব না খাওয়া ভালো।

ওজন ও ব্যায়াম

ওজনাধিক্যের পাশাপাশি ব্যায়ামবিমুখতায় রক্তে চর্বির চলাচল প্রভাবিত হচ্ছে। অতিরিক্ত ওজন দেহে ক্ষতিকর এল ডি এল এর মাত্রার উপর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ফেলে। প্রয়োজনে ওজন কমানো এবং ব্যায়ামের পরিমাণ বৃদ্ধি এই প্রবণতাকে বিপরীতমুখী করে। আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে- সহজ একটি ব্যায়ামে কোলেস্টেরলের মাত্র কমে আসে, যেমন: ৯ ইঞ্চি উচ্চতার টুলের উপর ২৪ বার করে উঠানামা যদি ৩ বার করা হয়, তাহলে রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে আসে।

অভিজ্ঞ ব্যাক্তিরা মনে করে থাকেন যে, অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বৈচিত্রময় বিনিয়োগ একমুখী বিনিয়োগ অপেক্ষা শ্রেয়। এই একই কথা আমরা কোলেস্টেরলের মাত্রা কমানোর ক্ষত্রেও বলতে পারি। যে কোন একটি বা দুইটি খাবারের উপর নির্ভর না করে বিভিন্ন উপায়ে কয়েকটি খাবারের মিশ্রণে তৈরী খাবার বেশি স্বাস্থ্যসম্মত। যেমন: মিক্সড নাট, মিক্সড অয়েল, মিক্সড ভেজিটেবল, মিক্সড ফ্রুটস ইত্যাদি।

বেশীরভাগ উদ্ভিজ্জ সমৃদ্ধ খাবার যথেষ্ট পরিমানে এল ডি এল, ট্রাইগ্লিসারাইড এবং রক্তচাপ কমাতে সাহায্যকারী।

সুস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে মূল পথ্য হল প্রচুর পরিমানে ফল ও শাক- সবজি গ্রহণ, পরিশোধিত খাদ্যশস্যের বদলে পূর্ণ শস্য গ্রহণ এবং উদ্ভিদ হতে বেশীরভাগ আমিষ গ্রহণ। এর পাশাপাশি উদ্ভিজ্জ স্টেরল, মার্জারিন, ওটস, বার্লি, সাইলিইয়াম, সেলেনিয়াম, ঢেঁড়স, বেগুন এবং অন্যান্য দ্রবণীয় আঁশযুক্ত খাবার, সয়াপ্রোটিন এবং কাঠবাদাম গ্রহণ করা স্বাস্থ্যসম্মত।

ভাল পরিমাণে ফল, সবজি, বীচিজাতীয় শস্য গ্রহণ শুধুমাত্র কোলেস্টেরলের মাত্রা কমানো নয়, অন্যান্য আরও শারীরিক সমস্যা মোকাবেলা করে থাকে। যেমন- রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখে, ধমনীগুলো নমনীয় এবং শিথিল রাখে, হাড়ের গঠন, হজমশক্তি ঠিক রাখার পাশাপাশি চোখ এবং মানসিক সুস্থতা বজায় রাখে।