ফল ও সবজিতে রাসায়নিক দ্রব্যের বিষক্রিয়া- সচেতন হউন

বিদেশি খাবারের চেয়ে দেশি খাবার উত্তম। যেমন: বিদেশি ফলের চেয়ে দেশি ফলে ভিটামিন এবং মিনারেল্স প্রায় ৮৩% বেশি। ইদানিং পত্র-পত্রিকায় বিভিন্ন শিরোনামে এই মধু মাসে দেশি ফলে কি কি ধরণের রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো হচ্ছে তা দেখা যাচ্ছে। এসব খবরের মাঝে আমরা কি খাবো??? এ বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই আছেন বিভিন্ন ধরণের বিষক্রিয়ার কথা ভেবে দেশি মৌসুমী ফল খাওয়াই কমিয়ে দিচ্ছে। এতে আমাদের স্বাস্থ্য সমস্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও হ্রাস পাচ্ছে।

লাইফস্টাইল ও ফুডহ্যাবিট

বর্তমানে বিশেষ করে শহরাঞ্চলে স্থুলতা অনেক বেড়ে গেলে। তার অন্যতম একটি কারণ ফল ও সবজি কম গ্রহণ করা। একেই আমাদের লাইফস্টাইলে অনেক পরিবর্তন এসেছে (যেমন: বসে বসে কাজ করা, ঘরোয়া কাজে পরিশ্রম না হওয়া, লিফ্ট ব্যবহার, রিমোট, মোবাইল, কর্ডলেস ফোন ব্যবহার ইত্যাদি)। আবার অন্যদিকে আমাদের খেলাধূলা কিংবা হাঁটাচলার স্থানও কমে গেছে। খাবারের ক্ষেত্রে রেডি ফুড, ফাস্টফুড, প্রোসেসড ফুড গ্রহণ অনেক বেড়ে গেছে। এতে আমাদের খাদ্যাভ্যাসে ছোট থেকেই শিশুদের ফল ও সবজি কম খাওয়ানো হচ্ছে। ছোট থেকেই মৌলিক খাদ্যগোষ্ঠির অভাবে সুষম খাদ্যতে অভ্যস্থ হওয়া কঠিন হচ্ছে। যার জন্য দেশে ওবেসিটির সাথে সাথে বিভিন্ন ধরণের রোগও বেড়ে যাচ্ছে।

ডায়েটে ফল ও সবজির প্রয়োজনিয়তা

দেহের প্রয়োজনের জন্যই কিংবা ব্যালেন্সড ডায়েট রাখতে প্রতিটি ব্যক্তির ফল ও সবজি অবশ্যই খেতে হবে। অন্যদিকে ওবেসিটি-ডায়াবেটিস-হৃদরোগ ইত্যাদি সমস্যায় ডায়েট হিসাবে ফল ও সবজিকে অবশ্যই প্রাধান্য দিতে হবে। আমাদের মৌসুমি ফল ও সবজি শুধুমাত্র বাজারে আসার সময় রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের শিকার হচ্ছেনা। ক্ষেতে থাকতেই রাসায়নিক উপাদান প্রয়োগে বাধ্য হচ্ছেন চাষি। বিক্রেতারা শহরাঞ্চলে বাজারে আসার আগে অনেক লম্বা পথ অতিক্রম করতে ফল, সবজি, মাছ ভাল রাখার জন্য নাকি এধরণের রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে।

ফল ও সবজিতে কিটনাশক ও গ্রোথ প্রোমোটার

বর্তমানে উৎপাদন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বীজ ফলে রূপান্তরের সময়ই বিভিন্ন ধরণের কিটনাশক ও গ্রোথ প্রোমোটারের ব্যবহার। প্রথমত এ উপাদানগুলো ব্যবহারের নির্দিষ্ট পরিমান বজায় রাখতে হবে। অন্যদিকে সংরক্ষণে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিতে হবে। প্রতিটি ফলের পরিপক্কতার একটি নির্দিষ্ট সময় থাকে। বেশিরভাগ সেই সময়ের আগেই গাছ থেকে ফল তোলা হয়। বিশেষ কিছু রাসায়নিক দ্রব্যাদির প্রয়োগে এগুলো পাকানো হয়। এতে ফলের পুষ্টিগুণও কমে যায়। জেনে রাখা প্রয়োজন ফল ও সবজি পচনশীল। কিন্তু আজকাল বেশিরভাগ সবজিতে যেমন কোন ধরণের পোকা থাকে না। অন্যদিকে পঁচেও না।

ফল সবজি ক্রয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন

যেহেতু ফল ও সবজি আমাদের গ্রহণ করতেই হবে সে জন্য যারা উৎপাদনের সাথে জড়িত, তাদেরকে সচেতনভাবে কৃষিকাজ করার জন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। আবার আমরা যখন বাজার থেকে ফল ও সবজি ক্রয় করবো সে বিষয়েও কিছুটা দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। যেমন:
– লাল রঙের টমেটোর পরিবর্তে দেশি টমেটো (অর্থাৎ যা দেখতে বেশি ভাল দেখায় না) সে টমেটো কেনা
– অসময়ের পাকা ফল না কেনা (যেমন ল্যাংড়া আমের সময় ফজলি আম চিন্তা না করা কিংবা পাকা ল্যাংড়া বা ফজলি যে সময়ে আসার কথা তার আগে বাজারে পাওয়া গেলে তা না কেনা)
– এক মৌসুমের ফল ও সবজি অন্য সময়ে না খাওয়া বা কেনার আসা না করা
– শীতের সবজি গ্রীষ্মের মৌসুমে না কেনা কিংবা গরমের ফল এর পরের মৌসুমে না কেনা
– দোকানের চকচক করা ফল ও সবজি না কেনা
– অতিরিক্ত পুষ্টি আছে এধরণের লেখা খাবারগুলো গ্রহণ না করা (যেমন: ওমেগা-৩ যুক্ত, কোলেস্টেরল ফ্রি খাবার)
– বিদেশি ফল ও সবজি না কেনা ইত্যাদি।

কেমিক্যাল গ্রহণ থেকে নিজেকে ও পরিবারকে কিছুটা হলেও নিরাপদে রাখার উপায়
প্রথমেই জানা প্রয়োজন যিনি বা যারা খাবারে বিভিন্ন ধরণের অপচনশীল রাসায়নিক উপাদান মেলাচ্ছেন, তারাই বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। তাৎক্ষনিক না বুঝতে পারলেও পরবর্তিতে সমস্যা হবেই। অতএব যারা এ ধরণের কাজের সাথে আছেন, তারা যেন এ ধরণের ক্ষতিকর কাজ থেকে বিরত রাখেন। তাছাড়া-

  • বাজার থেকে ফল ও সবজি আনার সাথে সাথে পানিতে আধা ঘন্টা থেকে ৪০মি. চুবিয়ে ফ্রিজিং করা
  • বেশিরভাগ সবজি কাঁচা না খেয়ে কিছুটা সেদ্ধ করে খাওয়া
  • মাছ ও মাংসকে ভিনেগারযুক্ত পানিতে ১ ঘন্টা চুবিয়ে রাখা
  • সবজি রান্নার সময় অধিক তাপে বাড়ে বাড়ে নাড়াচাড়া করে অল্প সময়ের মধ্যে যেন সেদ্ধ হয় এভাবে রান্না শেষ করা
    মাছ বা মাংস সম্পূর্ণ সেদ্ধ করে রান্না করা ইত্যাদি।

ফল ও সবজি গ্রহণ ভোক্তাদের অধিকার। এই অধিকার থেকে নিজেকে এবং অন্যকে যেন কেউ বঞ্চিত না করে। সচেতন নাগরিক দেশের সম্পদ। দীর্ঘ ১১ বছর যাবৎ বিভিন্ন ভাবে ডায়েট কাউন্সেলিং সেন্টার ফল ও সবজি গ্রহণের বিষয়ে বিভিন্নভাবে সচেতন করে আসছে।