প্রোবায়োটিক্স কি?

খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (FAO/WHO)  দেওয়া সংজ্ঞা অনুযায়ী – প্রোবায়োটিক্স হচ্ছে জীবন্ত অনুজীবসমূহ যা পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্রহণ করলে মানবদেহের স্বাস্থ্য রক্ষায় উপকারী ভূমিকা পালন করে থাকে। অন্য ভাবে বলা যায় যে, প্রোবায়োটিক্স হচ্ছে নন-প্যাথোজেনিক অণুজীবসমূহ যেগুলো মানবদেহের পাকস্থলী এবং অন্ত্রে অবস্থান করে মানবদেহের জন্য উপকারী কাজ করে থাকে। এদের মধ্যে ইস্ট অথবা ব্যাকটেরিয়া, বিশেষ করে ল্যাকটিক এসিড ব্যাকটেরিয়া উল্লেখযোগ্য। এগুলো খাদ্যে এবং মানবদেহের অন্ত্রে পাওয়া যায় এবং খাদ্যের মাধ্যমে গ্রহণ করার পর মানবদেহের স্বাস্থ্য রক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে থাকে।

প্রোবায়োটিক্স কি কোন নতুন ধারণা?

আসলে প্রোবায়োটিকসের ধারণাটা নতুন নয়। দুগ্ধজাত ফার্মেন্টেড খাদ্য রূপে এগুলো শত শত বছর ধরে গৃহীত হয়ে আসছে। আমরা যদি ১০০ বছর আগে ফিরে তাকাই, তাহলে দেখতে পাই যে, বুলগেরিয়ান কৃষকগোষ্ঠী নিয়মিত দই গ্রহণ করায় তারা দীর্ঘজীবি ছিল। ১৯৩০ খ্রীঃ জাপানী চিকিৎসক মিনরু শিরোটা বলেছেন যে, “অন্ত্রে সঠিক পরিমাণে ব্যাকটেরিয়া মিশ্রিত হলে অনেক রোগ প্রতিরোধ করা যায়”। ওকিনাওয়ান খাদ্য তালিকাতে প্রধান খাদ্য হিসাবে সয়াবিন পেস্ট থেকে ফার্মেন্টেড প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত মিসো স্যুপ ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আমাদের দেশে যুগ যুগ ধরে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় ফার্মেন্টেড দুগ্ধজাত খাদ্য হিসাবে দই, পনির এবং ঘোল গৃহীত হয়ে আসছে।

প্রোবায়োটিক্স কিভাবে কাজ করে?

অনেক উপকারী ও অপকারী ব্যাকটেরিয়া আমাদের পরিপাক তন্ত্রে বসবাস করে। এই অনুজীবগোষ্ঠিকে গাট মাইক্রোবায়োটা বা গাট ফ্লোরা বলা হয়। অন্ত্রে প্রায় ১০ ট্রিলিয়ন অনুজীবের মধ্যে প্রায় ১০০০ বিভিন্ন প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া রয়েছে। অন্ত্রে অবস্থিত উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো মানবদেহে মিথোজীবিত্ব বা সিমবায়োটিক সম্পর্ক তৈরি করে দেহের জন্য ইতিবাচক কার্যাদি সম্পন্ন করে থাকে। খাদ্যের মধ্যে অবস্থিত অথবা পরিপূরক হিসাবে গৃহীত প্রোবায়োটিক্স অন্ত্রে অণুজীবের সমতা রক্ষায় কাজ করে অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি করে স্বাস্থগত অবস্থা উন্নয়নে এবং বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

স্বাস্থ্যের জন্য প্রোবায়োটিক্স এর উপকারী ভূমিকা

অন্ত্রের অণুজীবগোষ্ঠীর স্বাভাবিক অথবা সমতা অবস্থা বজায় থাকলে এইগুলো মানবদেহের বিভিন্ন উপকারী কাজ সম্পন্ন করে থাকে। যেমন-

অন্ত্রের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে উদ্দীপিত করে। কিছু কিছু পুষ্টি উপাদান উৎপাদন করে। যেমন-শর্ট চেইন ফ্যাটি এসিড, কিছু ভিটামিন, এমাইনো এসিড (আরজিনিন, সিসটিইন, গ্লুটামিন), পলিএমাইনস, গ্রোথ ফ্যাক্টরস, কিছু এন্টিঅক্সিডেন্টস। বয়স্ক ও শিশুদের বিভিন্ন প্রকারের ডায়রিয়া (এন্টিবায়োটি-সম্পর্কিত, সংক্রমণঘটিত ইত্যাদি) তীব্রতা ও স্থিতিকাল কমিয়ে আনতে প্রোবায়োটিক্স ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করে। শিশুদের একিউট সংক্রমণজনিত ডায়রিয়ায় নিরাপদ ও ফলপ্রসূ চিকিৎসায় Lactobacillus উল্লেখযোগ্য।

Irritable bowel syndrome (IBS) এর লক্ষণসমূহের তীব্রতা কমাতে সাহায্য করে।

প্রোবায়োটিক্স আলসারেটিভ কোলাইটিসে বারবার আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা কমায়।

কিছু কিছু প্রোবয়োটিকস্ পরিপাকতন্ত্রে আলসার এবং ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া Helicobacter pylori এর বৃদ্ধিকে প্রতিহত করে থাকে।

ল্যাকটোজ অসহনশীলতায় দইএ অবস্থিত প্রোবায়োটিক্স ক্ষুদ্রান্ত্রে ল্যাকটোজ পরিপাকে সাহায্য করে থাকে। দই এ L.bulgaricus এবং Streptococcus thermopiles উপস্থিতিতে ল্যাকটোজ ভাঙতে সাহায্য করে।

প্রোবায়োটিক্স মানবদেহের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, নিয়মিত খাদ্যে প্রোবয়োটিকসের উপস্থিতিতে শিশুদের ঠান্ডালাগা এবং ফ্লু সদৃশ্য লক্ষণগুলো কমে আসে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, ওজনাধিক্য ও ওজনাধিক্য-সম্পর্কিত ইনফ্লামেশন সৃষ্টিতে আন্ত্রিক অনুজীবগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্ত্রের অনুজীবগুলোর পরিবর্তনের সাথে ওজনাধিক্যের সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, পাতলা ব্যক্তির এবং মোটা বাক্তির অন্ত্রে অবস্থিত অনুজীবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ওজন নিয়ন্ত্রণে এবং ওজনাধিক্য প্রতিরোধ প্রোবায়োটিক্স এর ব্যবহার অত্যন্ত ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করে থাকে।

টাইপ-২ ডায়াবেটিসের সাথে অন্ত্রের অনুজীবগুলোর সম্পর্ক রয়েছে। প্রধানতঃ অন্ত্রের অনুজীবগুলো প্রাক-ডায়াবেটিক অবস্থা তৈরি করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে অর্থাৎ ইনসুলিন রেজিসটেন্স সৃষ্টি করে। সুস্থ্য স্বাভাবিক ওজনের ব্যাক্তির তুলনায় যাদের ইনসুলিন রেজিসটেন্স রয়েছে সেই সকল মোটা ব্যাক্তিদের ক্ষেত্রে Firmicutes/Bacteroidetes রেশিও বেশি থাকে।

অতি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রোবায়োটিক্স উদ্বেগ ও মানসিক চাপ কমায় এবং মানসিক দৃষ্টিভঙ্গির উন্নয়ন ঘটায়। অন্য গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রোবায়োটিক্স বিশেষ করে L.helveticus এবং Bifidobacterium longum মানসিক অবসাদ, রাগকে কমায় এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতাকে বৃদ্ধি করে।

প্রোবায়োটিক্স অন্ত্র হতে ক্ষতিকর ও সক্রিয় কারসিনোজেনের সংশ্লেষণ ও শোষণ কমিয়ে দেয় এবং টিউমারের বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, কোলনে ল্যাকটিক এসিড ব্যাকটেরিয়া কারসিনোজেন উৎপাদনকে প্রতিহত করে।

একই বয়সের শিশুদের তুলনায় যে সকল শিশুদের বর্ধণ ধীর গতি সম্পন্ন তাদের ক্ষেত্রে গ্রহনযোগ্য প্রোবায়োটিক্স খাদ্য প্রদানে বর্ধনের উল্লেখযোগ্য উন্নতি পরিলক্ষিত হয়।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, লিপিড প্রোফাইলের উন্নয়নে বিশেষ করে সিরাম টোটাল কোলেস্টেরল, এল ডি এল এবং টি জি এর মাত্রা কমাতে এবং এইচ ডি এল এর মাত্রা বৃদ্ধিতে প্রোবায়োটিকস্ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।

নন-এলকোহলিক ফ্যাটি লিভার এর চিকিৎসায় প্রোবায়োটিকস্ এর প্রভাবে লিভারের সার্বিক উন্নয়ন ঘটে, লিভারের টোটাল ফ্যাটি এসিডের পরিমাণ কমে যায় এবং সিরামে এ এল টি এর মাত্রা কমে আসে। হাইপারটেনশন জার্নালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী উচ্চ রক্তচাপের নিয়ন্ত্রণে প্রোবায়োটিকস্ এর ভূমিকা সম্পর্কে জানা গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ব্যক্তিকে পানীয় বা খাদ্যের মাধ্যমে যেমন-দই বা কফির অথবা পিল রূপে প্রোবায়োটিকস্ গ্রহণে রক্তচাপ কমে আসে। এছাড়াও কোষ্ঠ্যকাঠিন্য দূর করতে এবং ত্বকের সুস্থ্যতা রক্ষায় ও সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে প্রাকৃতিক প্রোবায়োটিকস্-দই খুবই উপকারী।

কি পরিমাণ প্রোবায়োটিকস্ প্রয়োজন?

প্রোবায়োটিকস্ এর ধরন, প্রজাতি এবং কি ধরণের কর্যকারিতা কাম্য তার উপর নির্ভর করে এর চাহিদা। বিভিন্ন ধরনের প্রোবায়োটিকস্ এর কার্যকারিতা ও উপকারিতার মাত্রা ভিন্ন। প্রতি পরিবেশন দইতে সাধারনত ১০ মিলিয়ন জীবন্ত প্রোবায়োটিকস্ কোষ থাকে। প্রোবায়োটিক্স যেহেতু স্থায়ীভাবে অন্ত্রে থাকে না। তাই প্রতিদিনই গ্রহণের জন্য সুপারিশ করা হয়। থেরাপেটিক প্রয়োজনে কোন কোন ক্ষেত্রে দিনে কয়েকবার বা প্রতিবেলার খাবারের সাথে প্রোবায়োটিক্স গ্রহণের জন্য নির্দেশিত হয়।

প্রোবায়োটিকসের খাদ্য উৎস

আমাদের দেশে দই, পনির, ঘোল, আচার ্ইত্যাদি প্রোবায়োটিক্স এর খাদ্য উৎস হিসাবে উল্লেখযোগ্য। তবে দই হচ্ছে প্রোবায়োটিক্স এর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উৎস। তাই সুস্থতা রক্ষায় বা থেরাপেটিক পুষ্টি ব্যবস্থাপনায় প্রাকৃত্রিক প্রোবায়োটিকেস্ হিসাবে দই এর ভূমিকা অতুলনীয়।