গর্ভকালীন মা ও শিশু উভয়ের জন্যই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটা অধ্যায়। আর এই গর্ভস্থ ভ্রুণের বেড়ে উঠার জন্য সকল পুষ্টির চাহিদা পূরন করে মা। গর্ভবতী মায়ের অতিরিক্ত খাবারের প্রয়োজন দু’টি কারণে – প্রথমত: নিজের স্বাস্থ্য সঠিক রাখা, দ্বিতীয়ত: গর্ভস্থ ভ্রুণের গঠন ও বৃদ্ধি ঠিক রাখা। গর্ভকালীন শেষ তিন মাসে মায়ের সুষম খাদ্যের পরিমাণ সঠিক না হলে শিশু কম ওজনের বা অপরিণত শিশুর জন্ম হয়। এমন কি শিশুর মৃত্যুও হতে পারে। পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের অভাবে গর্ভবতী মায়ের রক্তস্বল্পতাসহ বিভিন্ন রকম রোগ ও অপুষ্টি দেখা দেয়, এবং গর্ভস্থ ভ্রুণের গঠন ও বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।

বাংলাদেশে সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, রক্তক্ষরণ হয়ে গর্ভবতী মা মারা যান ২৪ শতাংশ, রক্তশূন্যতায় ১৯ শতাংশ, একলামসিয়া বা খিচুনিতে ১৫ শতাংশ, সেপসিসে বা সংক্রমণে ৮ শতাংশ এছাড়া গর্ভপাতে ১২ ও অন্যান্য কারণজনিত ২২ শতাংশ মার মৃত্যু হয়। তাই গর্ভবতী মায়ের পুষ্টি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। গর্ভাবতীর বয়স ও শারীরিক অবস্থা ভেদে দৈনিক খাদ্যতালিকা ও পরিমাণ চাহিদানুযায়ী পরিবর্তনে চিকিৎসকের পাশাপাশি পুষ্টিবিদ বা ডায়েটেশিয়ানের পরামর্শ নেয়া যেতে পারে।

গর্ভবস্থায় একজন মা যে খাবার খাবেন তার স্বাভাবিক অবস্থার চাহিদা হবে এক পঞ্চাংশেরও বেশি অর্থাৎ মার দিনের মূল খাবার তিনবার এবং দুইবার নাস্তার স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি পুষ্টিকর খাবার যা কিনা মূল খাবার থেকে এক মুঠো বেশি খাবার খেতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন, গর্ভবতীর খাবারে শুধু ভাত দিয়ে পেট না ভরে শাক-সবজি ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার থাকে। একজন গর্ভবতীবস্থায় দৈনিক খাদ্য তালিকায় কমপক্ষে খাদ্যশক্তি=২৪৫০ কিলোক্যালরি এবং আমিষ প্রায় ৬০ গ্রাম, শর্করা ৭৬০ গ্রাম এবং আঁশ বহুল হতে ১৮০-২০০ গ্রাম থাকা অত্যন্ত জরুরি এবং গর্ভস্থ ভ্রুণের দিনে দিনে বেড়ে উঠার সাথে সাথে মার খাবার গ্রহণের হারও বৃদ্ধি পেতে থাকে তাই গর্ভবস্থায় শেষের দিকে হঠাৎ করে খাদ্যশক্তির পরিমাণ (২৫০০ থেকে ২৭০০ ক্যালরিতে) আরো বেড়ে যায়।

সামর্থ্য অনুযায়ী সুষম খাদ্যতালিকায় ভাত বা রুটি বা আলু, আমিষের মধ্যে ডিম/কলিজা/মাথাসহ ছোটমাছ/মুরগির গোস্তসহ দুধ বা দুধের  তৈরি পুষ্টিকর খাবার এবং পাশাপাশি যে কোন ধরনের ডাল যেমন: মুসর, মুগ, মটর, মাষকালাই, অড়হর দিতে হবে। রঙিন ফল এবং শাক-সবজির মধ্যে যেমন: আম, কাঁঠাল, পাকা পেঁপে, কলা, পেয়ারা, পালংশাক, কচুশাক, লালশাক, হেলেঞ্চাশাক, মিষ্টি কুমড়া, শিম, বরবটি, গাজর অথবা যে কোন মৌসুমী ফল এবং শাক-সবজি প্রতিদিন খাবারে থাকতে হবে এবং এই আঁশবহুল খাবার নিরাপদ পানি দিয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে। গর্ভাবতী মাকে প্রতিবার প্রচুর পরিমাণে নিরাপদ পানি পান করতে হবে এবং প্রতিবার খাওয়ার আগে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিতে হবে।

গর্ভকালীন সময়ে মাকে প্রচুর পরিমাণে আয়রণ সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে এবং রক্তস্বল্পতা বা এনিমিয়া প্রতিরোধে প্রতিদিন ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী আয়রন বড়ি বা ট্যাবলেট খেতে হবে। রক্তস্বল্পতায় গর্ভবতী মায়ের শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে এবং স্বাভাবিক কর্মতৎপরতা কমে যায়, তাছাড়া গর্ভকালে রক্তস্বল্পতার কারণে কম ওজনের শিশুর জন্ম হতে পারে। গর্ভাবস্থায় মায়ের পুষ্টির নিশ্চিত করতে মার খাবারে আয়োডিনযুক্ত লবণ থাকা জরুরি। এই আয়োডিনের অভাবে গলগণ্ড বা ঘ্যাগ হয়, নবজাতক শারীরিক ও মানসিকভাবে বিকলাঙ্গ হতে পারে এমনকি গর্ভের শিশু মারাও যেতে পারে।

এছাড়াও গর্ভকালীন সময়ে মাকে রাতে কমপক্ষে ৬-৮ ঘন্টা ঘুমাতে হবে ও দিনের বেলায় কমপক্ষে ২ ঘন্টা বিশ্রাম নিতে হবে এবং ভারী কাজ  থেকে বিরত থাকতে হবে।