আমাদের দেশে অনেক মা বাবাই শিশুর জীবনের প্রথম দিকে ওজন বৃদ্ধিকে আনন্দের সাথে নেন। সংস্কারগত ভাবেই আমরা খেতে ভালবাসি। কিন্তু মা বাবা হিসাবে অনেকেই তাদের শিশুর অত্যধিক ওজন বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাবগুলো নিয়ে চিন্তা করেন না। যখন একটি শিশুর শৈশবকালে বয়স এবং উচ্চতার তুলনায় ওজন অনেক বেশি হয় তখনই শিশুর স্থূলতা দেখা যায়। শৈশবকালীন স্থূলতা যদি পরিণত বয়সেও থেকে যায় তাহলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যেমন ধমনি ও শিরা সংক্রান্ত রোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং উচ্চ কোলেস্টেরল।

শিশু স্থুলতা কারণ

ছেলেমেয়েরা অনেক কারণে স্থুলতায় ভুগতে পারে। প্রধান কারণগুলো হল শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, অতিরিক্ত ফাস্টফুড খাওয়া, চিনি বা চিনি জাতীয় খাবার বেশি খাওয়া, কোমল পানীয় খাওয়া অথবা এগুলোর সম্মিলিত ফলাফল। আবার কখনো কখনো হরমোনাল কারণেও ছেলেমেয়েদের স্থূলতায় ভুগতে দেখা যায়। মাতৃত্বকালীন  সময়ে যদি কোন মা স্থুলতায় ভুগে থাকে অথবা প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ করে তাহলে শিশুকে স্থুলতায় ভুগতে দেখা যায়। এটা  শুধু যে জীনগত কারণে হয় সেটা নয়, বরং মায়ের শরীর থেকে অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদান ফিটাস এর শরীরে প্রবেশ করে ফলে ফিটাস এর শরীরে কিছু স্থায়ী পরিবর্তন আনে যেমন ক্ষুধা, নিউরোএন্ডোক্রাইন ফাংশন এবং বিপাকীয় পরিবর্তন। তাছাড়া গবেষণায় দেখা গেছে যেসব মা পেটে বাচ্চা থাকা অবস্থায় অত্যধিক হাইপারগ্লাইসেমিক ডায়েট খায় তাদের ম্যাক্রোসমিক বাচ্চা বা বড় বাচ্চা হয় এবং এসব বাচ্চা শিশুকালে স্থূলতায় ভুগে। একটা ছেলে অথবা মেয়ের শৈশবকালে ওজন কত হবে সেটা নির্ভর করে সে কতটুকু পরিমাণে ক্যালরি গ্রহণ করছে এবং কতটুকু পরিমাণে ব্যয় করছে তার উপর। আজকাল দেখা যায় ছেলেমেয়েরা দিনের অনেকটা সময়ে ঘরে বসে থাকে টিভি, কম্পিউটার এবং ল্যাপটপ নিয়ে এবং এটা সেটা খেতেই থাকে এতে তাদের শরীর যেমন অকার্যকর হয়ে পড়ে তেমন আস্তে আস্তে তাদের ওজনও বাড়তে থাকে।

শিশু স্থুলতার ফলাফল

শিশু স্থুলতার কারণে পরিণত বয়সে শিশু মৃত্যুহার অনেকাংশে বেড়ে যায়। অধিকাংশ স্থুল শিশু পরিণত বয়সেও স্থুলতায় ভুগতে থাকে এবং বিভিন্ন প্রকার অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে।

স্থুল শিশুদের যেসব রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে সেগুলো হল:

  • ধমনি ও শিরা সংক্রান্ত রোগ।
  • ক্যানসার
  • অ্যাজমা
  • ফ্যাটি লিভার
  • অনিয়মিত ঋতুচক্র
  • উচ্চ রক্তচাপ
  • গলব্লাডার স্টোন
  • এছাড়া স্থুল শিশুদের শারীরিক আকৃতি মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সে হতাশা ও হীনমন্যতায় ভুগতে থাকে। চরম হতাশার কারণে তার মধ্যে আচরনগত সমস্যাও দেখা যায়, যেমন খিটখিটে মেজাজ হওয়া।
শিশু স্থুলতায় করণীয়

পারিবারিক সহযোগিতা হল স্থুল শিশুদের সবচেয়ে বড় চিকিৎসা। স্থুল শিশুদের ওজন কমানোর ডায়েট দেওয়া যাবে না। কারণ ওজন কমানোর ডায়েট দিলে তাদের শারীরিক উচ্চতা বৃদ্ধি ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিকাশ ঠিক মত হবে না। এদের খাদ্য গ্রহণে পরিবর্তন আনতে হবে এবং সুনিয়ন্ত্রিত সক্রিয় জীবন যাপনে উৎসাহিত করতে হবে।

  • স্থুল শিশুদের তাদের প্রয়োজনীয় ক্যালরির সমান পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে এবং অধিক ক্যালরিযুক্ত খাবার বাদ দিতে হবে।
  • অধিক পরিমাণে শাক-সবজি, ফলমূল, শস্য জাতীয় খাবার দিতে হবে।
    কম ফ্যাট যুক্ত দুধ বা ফ্যাট বিহীন দুধ দিতে হবে।
  • প্রোটিনের উৎস হিসাবে এদেরকে কম ফ্যাট যুক্ত মাছ, মাংস, ডাল, শিমের বিচি এগুলো দিতে হবে।
  • স্থুল শিশুদের খাবার মাপ অনুযায়ী দিতে হবে।
  • পরিমিত পরিমাণে পানি খেতে হবে।
  • চিনি জাতীয় খাবার, কোমল পানীয় খাওয়া কমিয়ে দিতে হবে।
  • অসম্পৃক্ত ফ্যাট, ট্রান্স ফ্যাট, অত্যধিক ক্যালরি যুক্ত খাবার যেমন পিজ্জা, হটডগ এসব খাবার বাদ দিতে হবে।
  • বেশি লবনাক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।
  • ছেলেমেয়েদের শারীরিক ভাবে সক্রিয় থাকার জন্যে উৎসাহিত করতে হবে যেমন হাঁটাচলা, সাঁতার, নাচ, জাম্পিং ইত্যাদি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে ছেলেমেয়েদের প্রতিদিন কমপক্ষে ১ ঘন্টা বাইরে খেলাধুলা করতে দিতে হবে।
  • দিনে ২ ঘন্টার বেশি ল্যাপটপ, টিভি, কম্পিউটার নিয়ে বসে থাকা যাবে না। শিশুদের বিনোদনের জন্যে সবসময় পরিবারের সাথে সক্রিয়ভাবে থাকার জন্যে উৎসাহিত করতে হবে।
  • বেশি বেশি ভিটামিন-সি জাতীয় শাকসবজি, ফলমূল খেতে হবে কারণ ভিটামিন সি ফ্যাট ভাঙতে সহায়তা করে।

স্থুল শিশুদের চিকিৎসা তাৎক্ষণিক ভাবে করলে কোন ভাল ফলাফল আসবে না। এদেরকে সময় নিয়ে আস্তে আস্তে খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবন যাপনে উৎসাহিত করতে হবে। পারিবারিক ভালবাসা এবং সহযোগিতা এদের সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার একমাত্র চাবিকাঠি।