জন্মের ১ ঘন্টার মধ্যে শালদুধসহ মায়ের দুধ খাওয়ালে নবজাতকের মৃত্যুর হার শতকরা ৩১ ভাগ কমে যায়। আর ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ালে (পানিও নয়) শিশু অসুস্থ হয় না, হৃষ্টপুষ্ট ও স্বাস্থ্যবান হয়ে বড় হয় এবং শিশুর মৃত্যুর ঝুঁকি আরো ১৩% কমে যায়। ৬ মাস বয়সের পর মায়ের দুধের পাশাপাশি সুষম পুষ্টিকর খাবার শিশুকে দেয়া হলে শিশুর মৃত্যুর ঝুঁকি আরো ৬% কমে যায়।

আমাদের ভাল করে জানতে হবে যে মায়ের দুধ ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর দেহের বৃদ্ধি ও মেধা বিকাশের সম্পূর্ণ উপাদান যোগাতে পারে। এরপর শিশুর উচ্চতা ও ওজন বৃদ্ধি হতে থাকে তখন আরও খাদ্যের দরকার হয়। এই প্রয়োজনীয় বৃদ্ধিকে বজায় রাখতে যে খাবার মায়ের দুধের পাশাপাশি দরকার হয় তাকেই পরিপূরক খাবার বলে। পরিপূরক খাবার পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করে, তাই এটি বাড়তি খাবার নয় বরং বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় খাবার।

৬ মাস বয়সের পর থেকে মায়ের দুধের পাশাপাশি বাড়তি খাবার না দিলে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি কমে যাবে, ফলে সে ছোট শরীর ও কম বুদ্ধির মানুষ হয়ে থাকবে। কেবলমাত্র যতটুকু শক্তি বা খাদ্য মায়ের দুধ থেকে শরীরের প্রয়োজন মিটায় তাই হবে দেহের আকার, তা যতই বয়স বাড়–ক না কেন। এ অবস্থাকেই আমরা বলি অপুষ্টি বা বয়সের তুলনায় খাটো, বয়সের তুলনায় ওজন কম বা রোগা। ৬ মাস বয়সের পরই শিশুদের মধ্যে বেশি চোখে পড়ে। বাংলাদেশ স্বাস্থ্য জরিপে (BDHS 2014) শিশু অপুষ্টির চিত্র (খাটো শিশু ৩৬%; ওজনে হালকা শিশু ৩৩%; গায়ে চিকন বা রোগা শিশু ১৪%) বেশ খারাপই। তার একটা মূল কারণ হল পরিপূরক বা ঘরে তৈরি খাবারের ঘাটতি।

ঘাটতি কেন তার ওপরেও অনেক তথ্য আছে।

কীভাবে আমরা বুঝব কোন বয়সে কেমন খাবার দিতে হবে?

বর্তমানে সঠিকভাবে বাড়তি খাবার দেয়া হচ্ছে মাত্র শতকরা ২৩ ভাগ শিশুকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বিশেষজ্ঞদের নিয়ে যে নীতিমালা তৈরী করেছে তা হল খাদ্যের ৬টি বিভাগের কমপক্ষে ৪টি বিভাগের খাবার যথেষ্ট পরিমানে শিশুকে দিতে হবে। তাহলে তার দেহবৃদ্ধি ও বুদ্ধি বিকাশের উপযুক্ত উপাদান পাবে।

খাদ্যের ৬টি বিভাগ হলো:

(ক) শস্যজাতীয় খাবার: চাল, গম, রুটি, মুড়ি, চিড়া ইত্যাদি

(খ) প্রাণিজ আমিষ জাতীয় খাবার: ডিম, মাছ, মাংস, কলিজা ইত্যাদি

(গ) উদ্ভিজ্জ আমিষ জাতীয় খাবার: মসুর ডাল, মুগ ডাল, ছোলার ডাল, বাদাম ইত্যাদি

(ঘ) ফল ও শাকসবজি: আম, কলা, পেয়ারা, কুল, পেপে, লাল শাক, পালং শাক ইত্যাদি

(ঙ) তেল ও চর্বি: সয়াবিন তেল, ঘি, মাখন ইত্যাদি

(চ) দুধ ও দুগ্ধ জাতীয় খাবার: দুধ, দই, ছানা মিষ্টি ইত্যাদি

পরীক্ষায় দেখা গেছে প্রাণিজ আমিষ অর্থাৎ ডিম, মাছ, মাংস ইত্যাদি খাবারের একটা বিশেষ ভূমিকা আছে যা ঠিকভাবে শিশুকে বাড়তে সাহায্য করে। এসকল খাবারের মধ্যে আরও কিছু উপাদান আছে যেগুলি কোন কৃত্রিম খাদ্যে পাওয়া যায় না। বয়স অনুযায়ী শিশুর খাবার তরল বা শক্ত হতে পারে। কিন্তু ৬ মাস পর শিশুরা মোটামুটি শক্ত খাবার দাঁত ও মাড়ির সাহায্যে খেতে পারে। রান্না করা মাছ বা মাংস সহজেই শিশুকে খাওয়ানো যায়। ছোট শিশু শুধুমাত্র তরল খাবার খেতে পারবে এই ধারনা ঠিক নয়। শিশু বড় হতে থাকলে ৬ মাস থেকে ২ বৎসর পর্যন্ত খাবারের পরিমাণ ও গুণগত মান নিয়মিত বাড়াতে হবে। খাবারের বৈচিত্র্য ও স্বাদ খাবারটিকে আকর্ষণীয় করে। একথা খেয়াল রাখতে হবে যে লম্বা হওয়ার জন্য হাড় বৃদ্ধির প্রয়োজন অ ার তার জন্য সরাসরি ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, দস্তা, ভিটামিন ডি ও আমিষ প্রয়োজন হয়। সেগুলি কোন খাবারে আছে তাও জানা দরকার। হাড় বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান ছোট মাছ, ডিম, দুধ, ডাল ও শাকসবজিতে প্রচুর পাওয়া যায় আর রৌদ্র কিরণে শরীরে ভিটামিন ডি’ও তৈরী হয়।

শিশুর দেহ বৃদ্ধি, গঠন ও মেধা বিকাশের জন্য তিনটি বিষয়ে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। UNICEF এর মতে একে পুষ্টির নিয়ামক বা পুষ্টি ত্রিভূজ বলা হয়।

খাদ্য নিরাপত্তা বলতে বোঝায় সারাদিনে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ যত পরিমাণ খাবারের প্রয়োজন তা সারা বৎসর প্রতিদিন নিশ্চিত থাকা ও ইচ্ছামাফিক হেরফের করে রুচি পরিবর্তন করে খাওয়া যায়। খাদ্যের মূলত ছয়টি উপাদান দরকার হয় যেমন ১) শর্করা জাতীয় ২) আমিষ জাতীয় ৩) চর্বি জাতীয় ৪) ভিটামিন জাতীয় ৫) খনিজ জাতীয় ৬) পানি।

বাড়ন্ত শিশুদের কোন খাদ্যের কতটুকু দরকার?

সাধারণত খাদ্যশক্তি বা ক্যালরি (Energy) এবং আমিষের (Protein) পরিমাণ হিসাব করে শিশুদের প্রয়োজনটি বুঝা যায়। প্রতি কেজি শরীরের ওজনের জন্য বয়স অনুপাতে হিসাব করতে হয়। ৬ থেকে ৮ মাস বয়সের শিশুকে মায়ের দুধ ছাড়া বাকি শক্তি দিতে হবে বাড়তি খাবার থেকে। এ সময় দরকার প্রতি কেজিতে ১১০ ক্যালরি অর্থাৎ ৭ কেজি ওজনের শিশুর প্রয়োজন ৭৭০ ক্যালরি আর আমিষ দরকার ১ গ্রাম প্রতি কেজিতে অর্থাৎ ৭ গ্রাম। এখানে ভাল আমিষ হলে শক্তির শতকরা ৮ ভাগ হলেই চলবে। প্রাণিজ আমিষ থেকে (Mwthionine) মিথিওনিন এবং উদ্ভিজ্জ আমিষ (ডাল জাতীয়) থেকে লাইসিন (Lysine) – নামক অত্যাবশ্যক

এমিনো এসিড পাওয়া যায়। এ দুটি কম হয়ে গেলে শরীর গঠনের মাংস বা আমিষ (Protein) তৈরি বন্ধ হয়ে যায়। সুতরাং এর গুরুত্ব খুব বেশি। শিশুর খাবারে ডিম থাকলে সবচেয়ে বেশি মিথিওনিন (Methoinine) ও ডাল থাকলে সবচেয়ে বেশি লাইসিন (Lysine) নিশ্চিত হয়, আমিষ (Protein) তৈরি ঠিকভাবে হয়।

৭ থেকে ৯ মাসের শিশুর পেট অনেক ছোট- বড়জোর একবারে ১০০ থেকে ১২০ গ্রাম পর্যন্ত খাবার ধরে। তাহলে কীভাবে তার চাহিদা পূরণ হবে?

কৌশল একটাই- সেটি হল শিশু বার বার খাবে, এ কথাটি মায়ের দুধের জন্য যেমন প্রযোজ্য তেমনি সম্পুরক বা বাড়তি খাবারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাড়তি খাবার তৈরিতে শক্তি ঘনত্ব বা Energy density বাড়াতে হবে যাতে ১ গ্রাম খাবারে ১.৫- থেকে ২.০ ক্যালরি থাকে আর তা করা যায় খাবারে তেল/ ঘি/ চর্বি/ মাখন এসব মিশিয়ে। কারণ ১ গ্রাম তেলে ৯ ক্যালরি পাওয়া যায়।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে সাধারণত ঘরের খাবার যা শিশুকে দেওয়া হয় তার শক্তি ঘনত্ব ০.৬-০.৭ ক্যালরি প্রতি গ্রামে। যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। প্রাণিজ আমিষ দেওয়া হয় অতি সামান্য- খাদ্য সংক্রান্ত ভুল ধারনার জন্য শিশুকে মাছ মাংস তেমন দেয়া হয় না। কেউ কেউ মনে করে মাছ, মাংস খেলে শিশুর ক্ষতি হতে পারে। আমাদের দেশে ‘সম্পূরক খাবারের’ অভ্যাস বা সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি।  প্রচলিত অনেক খাবারই আছে যা শিশুকে দেয়া যায় কিন্তু পরিমাণ বা গুণগত ধারনা আমাদের সকলের জানা নেই।ঘরে তৈরি করা দেশীয় খাবারের দ্বারা আমাদের শিশুকে স্বাস্থ্যবান করে গড়ে তোলা যায় যা এদেশেরই বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া গেছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। সহজলভ্য ও স্বল্পমূল্যে ঘরে তৈরি খাবার হতে পারে খিচুড়ি যাতে থাকে ২ মুঠ চাল, ১ মুঠ ডাল, ১টি ডিম, ৫ চা চামচ তেল ও ১ মুঠ শাক-সবজি। এতে ৬৫০ ক্যালরি  শক্তি ও ২০ গ্রাম আমিষ থাকে। এই খিচুড়ি একবার রান্না করে ৪ ভাগ করে শিশুকে খাওয়ানো যায়। রান্না করা সাধারণ খাবারের মাঝ থেকে এ সকল উপাদান নিয়ে একত্রে মিশিয়ে খিচুড়ি তৈরি করা যায়, তবে তেলটা আলাদা দিতে হয়।

দেশীয় খাবার যেমন পায়েস, ফিরনী, হালুয়া, সেমাই, মাছ, ডাল, ভাত, ডিম, মাংস, পুরি, পিঠা, ডালের বড়া, মাছের কাটলেট, ডাল ও মাংস দিয়ে বড়া, দুধের পায়েস,সবজি বড়া, মাছের চপ ইত্যাদি হতে পারে। এছাড়া পরিমিত পানি ও শরবত দেয়া যায়। কিন্তু মূলকথা হল শক্তি ঘনত্ব – পর্যাপ্ত পরিমাণে তেল দিয়ে শক্তিঘনত্ব বৃদ্ধি করতে হবে। আমিষ দিতে হবে ডিম/মাছ/মাংস ও ডাল দিতে হবে। ভাত, আলু, আটা অবশ্যই থাকবে কিন্তু পরিমাণ অর্ধেক এর বেশি হবে না।

শিশুর সুস্বাস্থ্যের জন্য বিদেশী খাবার বা কৌটাজাত খাবারের কোন প্রয়োজনই নেই।

সাধারণ হিসাবে খাবারের শর্করা ৬৫%,আমিষ ১৫% ও চর্বি ২০% শক্তির উৎস হলে ভাল হয়। শিশুর দৈনিক বাড়তি খাবার হিসাবের মোটামুটি ধারণার জন্য নিচের তালিকা থেকে সাহায্য নেয়া যায়:

ঘরে তৈরি করা দেশীয় খাবারের দ্বারা আমাদের শিশুকে স্বাস্থ্যবান করে গড়ে তোলা যায় যা এদেশেরই বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া গেছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। সহজলভ্য ও স্বল্পমূল্যে ঘরে তৈরি খাবার হতে পারে খিচুড়ি যাতে থাকে ২ মুঠ চাল, ১ মুঠ ডাল, ১টি ডিম, ৫ চা চামচ তেল ও ১ মুঠ শাক-সবজি। এতে ৬৫০ ক্যালরি  শক্তি ও ২০ গ্রাম আমিষ থাকে। এই খিচুড়ি একবার রান্না করে ৪ ভাগ করে শিশুকে খাওয়ানো যায়। রান্না করা সাধারণ খাবারের মাঝ থেকে এ সকল উপাদান নিয়ে একত্রে মিশিয়ে খিচুড়ি তৈরি করা যায়, তবে তেলটা আলাদা দিতে হয়।

দেশীয় খাবার যেমন পায়েস, ফিরনী, হালুয়া, সেমাই, মাছ, ডাল, ভাত, ডিম, মাংস, পুরি, পিঠা, ডালের বড়া, মাছের কাটলেট, ডাল ও মাংস দিয়ে বড়া, দুধের পায়েস,সবজি বড়া, মাছের চপ ইত্যাদি হতে পারে। এছাড়া পরিমিত পানি ও শরবত দেয়া যায়। কিন্তু মূলকথা হল শক্তি ঘনত্ব – পর্যাপ্ত পরিমাণে তেল দিয়ে শক্তিঘনত্ব বৃদ্ধি করতে হবে। আমিষ দিতে হবে ডিম/মাছ/মাংস ও ডাল দিতে হবে। ভাত, আলু, আটা অবশ্যই থাকবে কিন্তু পরিমাণ অর্ধেক এর বেশি হবে না।

শিশুর সুস্বাস্থ্যের জন্য বিদেশী খাবার বা কৌটাজাত খাবারের কোন প্রয়োজনই নেই।

সাধারণ হিসাবে খাবারের শর্করা ৬৫%,আমিষ ১৫% ও চর্বি ২০% শক্তির উৎস হলে ভাল হয়। শিশুর দৈনিক বাড়তি খাবার হিসাবের মোটামুটি ধারণার জন্য নিচের তালিকা থেকে সাহায্য নেয়া যায়:

 

বয়স (মাস)ওজন (কেজি)ক্যালরিপ্রোটিন (গ্রাম)শক্তি ঘনত্ব (কিলোক্যালোরি/গ্রাম)দৈনিক কতবারপ্রতিবারে কতটুকু (গ্রাম)

 

৬-৮৮.৫৬১৫৮.৫১.৫২-৩ বার১৩৬
৯-১১৯.৬৬৮৬৯.৬১.৫৩ বার১৫০
১২-২৪১২.২৮৯৪১২.২১.৫৪ বার১৫০

 

৬ মাসের পর শক্তির উৎস: ৬ মাসের পর শক্তি চাহিদার ৪০% আসে মায়ের দুধ থেকে এবং পরে আরো কম আসে। তাই বাড়তি খাবারে বাকি শক্তির চাহিদাপূরণ করতে হবে।