উন্নত ঘুম (সাউন্ড স্লিপ) বিভিন্ন ধরণের রোগ প্রতিরোধে সহায়ক

হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয় হতে প্রকাশিত সেপ্টেম্বর, ২০১৭

উন্নত ঘুম (sound sleep) বিভিন্ন ধরণের রোগ প্রতিরোধে সহায়ক

আল্জেইমার (অসময়ে স্মৃতি ভ্রম ও মনে রাখার প্রবণত লোপ পাওয়া) এর কথা আসলে শুরুতেই অ্যামাইলোইয়েড প্রোটিনের কথা বলতে হয়। প্রতিদিন যখন মস্তিষ্ককে বিভিন্ন কোষ সংকেত প্রদান করে তখন মস্তিষ্কে জমা হওয়া বর্জ্য পদার্থগুলো শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বের হয়। গভীর ঘুমের সময় ক্ষতিকর উপাদান অ্যামাইলোয়েড প্রোটিন গুলো মস্তিষ্ক থেকে বের হয়ে যায় এবং স্মৃতি গুলো জমা হয়। রাতের ৮ ঘণ্টা ঘুমের মধ্যে ঘুমের সমস্যা হতে পারে দুই ঘণ্টা, চার ঘণ্টা, ছয় ঘণ্টা, এমনকি সাত ঘণ্টাও।

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে, ঘুম কম কিংবা গভীর ঘুম না হলে অ্যামাইলোয়েড প্রোটিনগুলো বেশী তৈরি হয় এবং মস্তিষ্কের কোষে প্ল্যাক তৈরী করে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, এটি আল্জেইমার রোগের প্রথম ধাপ, যা ঘুমের সমস্যার এক বছরের মধ্যে উপসর্গ গুলো দেখা দিতে পারে। ৩০ মে ২০১২ সালের  “জামা নিউরোলজি” প্রমাণ করেন যে, এই প্ল্যাকগুলো পরবর্তী চার বছরের মধ্যে মস্তিষ্কের অন্যান্য কার্যকরীতার উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।

অগভীর ঘুম ও অ্যামাইলোইয়েড প্ল্যাকের অবাধ্য চক্রের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে। যত বেশি অ্যামাইলোইয়েড তৈরি হবে তত গভীর ঘুম কম হবে। ঘুম যত কম হবে মস্তিষ্ক হতে অ্যামাইলোইয়েড বের করতে কম সময় পাবে। অগভীর ঘুমের কারণে প্ল্যাক হয়, নাকি অ্যামাইলোইয়েড প্ল্যাগ তৈরির কারণে অগভীর ঘুম হয় তা এখনও পরিষ্কার নয়।

২০১৫ সালের ”নেচারাল নিউরোসাইন্স” এর ২৬ বছর বয়স্ক ব্যক্তি, ৬৫-৮১ বছর ব্যক্তিদের উপর গবেষণা করেন যারা কেউই ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত নয় এবং যাদের ঘুমের সমস্যা নেই। তখনই প্রথম পিইটি স্ক্যানে মস্তিষ্কের অ্যামাইলোইয়েড লেভেল পরিমাপ করেন। সেখানে ১২০ জোড়া শব্দ মুখস্ত করানো হয় এবং এই প্রোটিন কিভাবে মনে রাখে তা দেখা হয়।

তারপর তাদের ৮ ঘণ্টা ঘুমাতে বলা হয় এবং সে সময় একটি মেশিনের সাহায্যে যখন ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, তখন মস্তিষ্কের তরঙ্গ পরিমাপ করা হয়। বিশেষত গভীর ঘুমের সময় জেগে উঠে কিনা তা নির্নয় করার জন্য এটি ব্যবহার করা হয়।

পরদিন সকালে সেই শব্দ গুলো মনে করার সময় তাদের মস্তিষ্ক পুনরায় স্ক্যান করা হয়। সর্বপরি দেখা যায় যে, যে সকল ব্যক্তির অ্যামাইলোইয়েডের মাত্রা বেশি ছিল তাদের ঘুমের ধরন সবচেয়ে খারাপ এবং স্মৃতিশক্তি ধারনক্ষমতা কম ছিল, এমনকি কেউ কেউ অর্ধেকের বেশি তথ্যই ভুলে গিয়েছিল।

অপরপক্ষে, ২০১৪ সালের আল্জহেইমার এবং ডিমেনশিয়ার গবেষণায় লক্ষ্য করা হয় অগভীর ঘুম আল্জহেইমার এর সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয় কিনা। গবেষকেরা ১০০০ বেশি পুরুষদের তাদের ৪০ বছরের ঘুমের অভিজ্ঞতার বিবরণ দিতে বলেন। তারা দেখতে পেলেন যে, যাদের ঘুমের কোন ব্যাঘাত হয় নি তাদের তুলনায় যাদের প্রতিনিয়ত ঘুমের ব্যাঘাত ঘটেছে তাদের পরবর্তীতে আল্জহেইমার হওয়ার ঝুঁকি দেড় গুণ বেশি।

কোন কোন সময় ঘুমের ব্যাঘাত হলে অনেকে প্রেসক্রিপশন সহ বা প্রেসক্রিপশন ছাড়া ঘুমের ঔষধ ক্রয় করে থাকেন এবং সাময়িকভাবে এ সমস্যা হতে মুক্তি পেয়ে থাকেন। কিন্তু যদি তারা এটির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন সেক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া আবশ্যক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমের ঔষধগূলো উত্তেজনা প্রশমনকারী হয়ে থাকে এবং প্রাকৃতিকভাবে ঘুম আনয়নকারী নয়। এগুলো ঘুমের পরিণাম বাড়াবে কিন্তু ঘুমের মানের উন্নয়ন ঘটাবে না। তাই স্বাভাবিক ঘুম অপেক্ষা কেউ যদি ঔষধের উপর নির্ভরশীল হয় তবে রাতে ঘুমের ভিতর মস্তিষ্কের যে কাজ করার কথা তাতে ব্যাঘাত ঘটে।

বিভিন্ন গবেষণার ফলাফলে এটা প্রতিয়মান হয় যে সাউন্ডস্লিপ কিংবা সম্পূর্ণ গুনগত ঘুম অ্যালজাইমার রোগ প্রতিহত করতে পাবে।

তাই প্রত্যেকের উচিত প্রাকৃতিক উপায়ে গুনগত ঘুমের জন্য চেষ্টা করা।

আলজাইমার বিশেষজ্ঞ ডঃ ডিকারসন মনে করেন, অ্যারোবিক ব্যায়াম গুনগত ঘুমের মান বাড়াতে সাহায্য করে। তারা আরও মনে করেন, এই ঝুঁকি কমাতে ওজন হ্রাস অন্যতম ভূমিকা পালন করে, কেননা যাদের ওজন বেশি তাদের ঘুমজনিত সমস্যাও বেশি। তিনি আরও বলেন, ঘুমের ভাল অভ্যাস গড়ে তোলা এবং ঘুম জনিত সমস্যা যেমন- ইনসমনিয়া, শ্লিপ অ্যাপনিয়া, ইত্যাদি অবহেলা না করে সুস্থ থাকার জন্য বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নেয়া খুব জরুরি।

ভাল ঘুমের জন্য কিছু টিপস

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ-

শোয়ার ঘর শান্ত রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অল্প সময়ের জন্য গভীর ঘুমান এবং শব্দ দূষণের কারণে তাড়াতাড়ি জেগে ওঠা অন্যতম সমস্যা। কিছু উপায়ে শব্দ দূষণ রোধ করা যায়, যেমন-

  • ভারী পর্দা ব্যবহার, যা শব্দ ভিতরে ঢুকতে বাঁধা প্রদান করে।
  • জানালায় দুই স্তর বিশিষ্ট কাঁচ ব্যবহার।
  • ঘুমের সময় এমন কোন ফ্যান ব্যাবহার করা যা মৃদু শব্দ যথা-বৃষ্টির শব্দ, সমুদ্রের ডেউ ইত্যাদি উৎপন্ন করে।
অনুজ্জ্বল বা ডিম লাইট ব্যবহার-

উজ্জ্বল বাতি রাতে ব্যবহারের ফলে আমাদের শরীরে মেলাটোনিন উৎপাদন বাধাগ্রস্থ হয় এবং ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। ঘুমানোর প্রস্তুতি নেওয়ার সময় তাই নিম্নোক্ত বিষয়গুলো মেনে চলা উচিত-

  • রাত ৯টার পর টেলিভিশন বা কম্পিউটার ব্যবহার হতে বিরত থাকা।
  • ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস, যেমন- মোবাইল, ট্যাব বা আই প্যাডে কোন কিছু না পড়া।
  • উজ্জ্বল বাতিগুলো কম ওয়াটের বাতিতে পরিবর্তন করা।
আরামদায়ক পরিবেশ-

বেডরুম যদি অতিরিক্ত গরম বা অতিরিক্ত ঠান্ডা হয় তবে তা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। বেশিরভাগ ব্যাক্তি হালকা শীতল ঘরে ঘুমিয়ে আরাম পান (প্রায় ৬৫ ডিগ্রী ফারেনহাইট)। তাছাড়া, অতিরিক্ত ব্যাবহৃত বিছানার চাদর এবং বালিশ পরিবর্তন করা উচিত।

 

স্বাস্থ্যবিষয়ক টিপস

অতিরিক্ত সময় বসে না থাকা-

অতিরিক্ত সময় ধরে টানা বসে থাকলে তা অন্যান্য রোগের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এর জন্য কিছু কৌশল আমরা অনুসরণ করা যেতে পারে-

যেমন মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় দাঁড়িয়ে বা হাঁটতে হাঁটতে কথা বলা, একনাগাড়ে অনেকক্ষণ টেলিভিশন দেখার ক্ষেত্রে বিরতির সময় একটু হাঁটাহাঁটি বা স্টেপিং করা, মেকআপ করার সময়, বসে না করে দাঁড়িয়ে করা ইত্যাদি। মোট কথা, প্রতি ৩০ মিনিট পর পর আমাদের কিছু সময় দাঁড়ানো উচিত।

ঘুমের এনজাইম মেলাটনিন উৎপাদনের জন্য ঘুমাতে যাবার আগে প্রতিদিন ১ কাপ ননিতোলা গরম দুধের সাথে ২টা কুচি করে কাটা চাপাকলা খেলে অবশ্যই ঘুম ভালো হবে।

গুণগত ঘুম মানুষের সুস্থতার সবচেয়ে বড় মেডিসিন। তাই অনেকেই যারা বিভিন্ন অজুহাতে রাতে জেগে দিনে ঘুমান, তাদের সেই অভ্যাস পরিহার করে রাতে ভালো ঘুমের জন্য চেষ্টা করা উচিত।